কপিরাইট কী ও কেন, কপিরাইট আইনের ধারাগুলো

★★★ কপিরাইট:মেধাসম্পদের রক্ষা ও এর ব্যবস্থাপনার সংগে নিবিড়ভাবে যে শব্দটি জড়িয়ে আছে তা হলো Copuright বা কর্মের অধিকার। ইংরেজী Copyright শব্দটির মধ্যেই এর অন্তর্নিহিত অর্থটি লুকিয়ে আছে। আমরা যদি Copy ও Right এভাবে আলাদা করে শব্দটির অর্থ বিশ্লেষণ করি তবে এর অর্থ দাড়াবে Copy করার অধিকার । অর্থাৎ সকল ধরনের সৃষ্টিশীল কর্মই যেমন- সাহিত্য, শিল্পকর্ম, সংগীত, চলচ্চিত্র, সফ্টওয়্যার ইত্যাদি স্রষ্টা বা রচয়িতার অনুমতি ছাড়া কপি, পুনরুৎপাদন, অনুবাদ, রূপান্তর বা অধিযোজন করা কপিরাইট ধারণা, আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি, দেশীয় আইন, নৈতিকতা ও ইতিবাচক বোধের চরম পরিপন্হি।

★★★ পাইরেসি কী ও এর কুফল :পাইরেসি কথাটা আজকাল বহুল পরিচিত। এর আভিধানিক অর্থ ‘গ্রন্থাদির স্বত্ব লঙ্ধন”। কিন্ত বর্তমান বিশ্বে পাইরেসি শব্দের অর্থমান বহুগণ সম্প্রারিত। ফলে পাইরেসি দিয়ে এখন কেবল গ্রন্থস্বত্ব লঙ্ঘনকে বোঝায় না। যেকোনো অনুমোদনবিহীন সৃষ্টিকর্মের পুনরুৎপাদনই পাইরেসি। বর্তমানে গ্রন্থ, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত ও কম্পিউটার সফ্টওয়্যার বাজারের প্রায় পরোটাই পাইরেটসদের দৃশ্য ও অদৃশ্য কালো জালে বন্দি। অনেক শিক্ষিত মানুষও আসল নকলের পার্থক্য বোঝেন না। অনেক সমর্থনবান ব্যক্তি ও তাদের সন্তানদের হাতে তুলে দিচ্ছেন পাইরেটেড বই। অথচ রঙ্গিন বিদেশী বই এর জায়গায় পাইরেটেড কপি পড়ে আমাদের প্রকৌশল ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা বারংবার প্রতারিত হচ্ছেন। বঞ্চতি হচ্ছেন Global Knowledge থেকে। পিছিয়ে পড়ছেন প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের প্রতিযোগিতায়। প্রযুক্তির যত উৎকর্ষ হচ্ছে, বিশেষ করে কম্পিউটার প্রযুক্তির উন্নয়নে যুগে যুগে কার সৃষ্টিকর্ম কিভাবে চুরির ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে তা সবসময় ঠিকভাবে বুঝে উঠও সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে ইন্টারনেট এ যুগে ঘরে বসেই আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কতিক কর্মের উপাদান বা উৎস হাতে পেয়ে যাচ্ছি। পাইরেসির কারণে কর্মের রচিয়তা বিঞ্চত হচ্ছেন রয়্যালিটি থেকে। পাঠক বঞ্চত হচ্ছেন প্রকৃত জ্ঞান থেকে আর সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব।

★★★ কপিরাইট সংকান্ত্র আন্তর্জাতিক আইন ও কনভেশন :বাংলাদেশ বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থা (WIPO) এর সদস্যভুক্ত দেশ হিসেবে WIPO পরিচালিত Bern Convention, UNESCO পরিচালিত Universal Copyright Convention (UCC) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) এর সদস্য হওয়ার কারনে এতদসংক্রান্ত সকল শর্ত মেনে চলতে বাধ্য।


★১. কপিরাইট আইন এর ২ (২৪) বিধি অনুযায়ী – “প্রণেতা” অর্থ-
★ক. সাহিত্য বা নাট্যকর্মের ক্ষেত্রে সুরকার বা রচিয়তা।
★খ. সংগীত বিষয়ক কর্মের ক্ষেত্রে সুরকার বা রচিয়তা।
★গ. ফটোগ্রাফ ব্যতীত অন্য কোন শিল্পসুলভ কর্মের ক্ষেত্রে নির্মাতা।
★ঘ. ফটোগ্রাফের ক্ষেত্রে চিত্রগ্রাহক।
★ঙ. চলচ্চিত্র অথবা শব্দ রেকডিং এর ক্ষেত্রে প্রযোজক।
★চ. কম্পিউটার মাধ্যমে সৃষ্ট সাহিত্য, নাট্য, সংগীত বা শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে কর্মটির সৃষ্টিকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।

★★★ ২. কপিরাইটের স্বত্ব নিয়োগ
কপিরাইট আইনের ১৮ ধারায় কপিরাইটের স্বত্ব নিয়োগ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কোন বিদ্যমান কর্মের কপিরাইটের স্বত্বাধিকারী বা ভবিষ্যত কর্মের কপিরাইটের সম্ভাব্য স্বত্বাধিকারী যে কোন ব্যক্তির নিকট কোন কপিরাইটের সম্পূর্ণ বা আংশিক মেয়াদের জন্য স্বত্ব নিয়োগ করতে পারেন্ তবে শর্ত থাকে যে, ভবিষ্যত কর্মের কপিরাইটের স্বত্ব নিয়োগের ক্ষেত্রে কর্মটি অস্তিত্বশীল হওয়ার পর স্বত্ব নিয়োগ কার্যকর হবে।

★★★ ৩. স্বত্ব নিয়োগের ধরন
কপিরাইট আইনের ১৯ ধারা মতে কোন কর্মের স্বত্ব নিয়োগ বৈধ হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্ত পূরণ করতে হবে:
★ক. স্বত্ব প্রদানকারী বা তার নিকট হতে যথাযথভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি কর্তৃক স্বাক্ষারিত হতে হবে।
★খ. কোন কর্মের কপিরাইটের স্বত্ব নিয়োগ অবশ্যই কর্মটিকে চিহ্নিত করবে এবং স্বত্ব নিয়োগকৃত অধিকার ও অধিকারের মেয়াদ এবং স্বত্ব নিয়োগের ভৌগোলিক পরিধি দলিলে উল্লেখ থাকবে।
★গ. কোন কর্মের কাপরাইটের স্বত্ব নিয়োগ দলিলে প্রদেয় রয়্যালিটির উল্লেখ থাকবে এবং পারস্পরিক স্বীকৃত মতে স্বত্ব নিয়োগ পুণ:নিরীক্ষণ, বর্ধিতকরণ বা বাতিলের ব্যবস্থা রাখা সাপেক্ষে হবে।
★ঘ. যে ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত স্বত্বাধিকারী তার নিকট প্রদত্ত অধিকার স্বত্ব নিয়োগের তারিখ হতে এক বৎসর ব্যবহার না করেন, সেক্ষেত্রে উক্ত সময়সীমা উত্তীর্ণের পর তামাদি হয়েছে বলে গণ্য হবে।
★ঙ. যদি কোন স্বত্ব নিয়েগের মেয়াদ উল্লেখ না থাকে বা স্বত্ব নিয়োগ দলিলে ভিন্নরূপ কিছু না থাকে তা হলে স্বত্ব নিয়োগের তারিখ হতে পরবর্তী পাচ বছরের জন্য এটি করা হয়েছে বলে গণ্য হবে।
★চ. যদি স্বত্ব নিয়োগের ভৌগলিক পরিধি উল্লেখ না খাকে তা হলে এর পরিধি বাংলাদেশের সর্বত্র বলে গণ্য হবে
★ছ. উপ-ধারা (খ), (গ), (ঘ), (ঙ), (চ)- এ উল্লেখিত বিধানাবলীর কোন কিছুই এই আইন কার্যকর হওয়ার পূর্বে সম্পাদিত স্বত্ব নিয়োগের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। (ধারা-১৯)

★★★ ৪. কপিরাইটের মেয়াদ
ফটোগ্রাফ ব্যতীত অন্যান্য কর্মের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কপিরাইট এর মেয়াদ প্রণেতার জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর ৬০ বছর পর্যন্ত (ধারা-২৪)। ফটোগ্রাফের ক্ষেত্রে কপিরাইট মেয়াদ ৬০ বছর (ধারা-২৮)।

★★★ ৫. কপিরাইট সমিতি
কপিরাইট আইন ২০০০ এর ৪১ ধারার বিধান মতে কপিরাইট সমিতি গঠন ও নিবন্ধন করা যায়। এজন্য নির্ধারিত ফরমে সমিতি নিবন্ধনের জন্য রেজিস্ট্রারের নিকট আবেদন করতে হবে। রেজিস্ট্রার উক্ত আবেদন সরকারের নিকট দাখিল করবেন। প্রণেতা এবং এ আইনের অধীন অন্যান্য অধিকারের মালিকদের স্বার্থ, জনস্বার্থ ও জনগণের সুবিধা, আবেদকারীর যোগ্যতা এবং পেশাগত দক্ষতা বিবেচনা করে সরকার নির্ধারিত শর্ত সাপেক্ষে কোন সমিতিকে কপিরাইট সমিতিরূপে নিবন্ধিত করবে। একই শ্রেণীর কর্মের ব্যবসা করার জন্য একের অধিক সমিতিকে নিবন্ধন করা যাবে না।

★★★ ৬. কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন
কপিরাইট রেজিস্ট্রাশনের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি এর ট্রেজারি চালান, কর্মের ২ কপি নমুনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দলিলসহ নির্ধারিত ফরমে রেজিস্ট্রার অব কপিরাইট এর নিকট আবেদন করতে হয়। রেজিস্ট্রার প্রয়োজনীয় তদন্ত সাপেক্ষে কর্মের বিবরন রেজিস্ট্রারে অর্ন্তভূক্ত করেন। (ধারা-৫৫)

★★★ ৭. দেওয়ানি এ ফৌজদারী প্রতিকারের বিধান
কপিরাইট লঙ্ঘনের বিষয়ে দেওয়ানি এবং ফৌজদারি উভয় ক্ষেত্রে প্রতিকার পাবার বিধান রয়েছে। দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা, ক্ষতিপূরণ আদায় ইত্যাদি এবং ফৌজদারি আদালতের মাধ্যমে কারাদন্ড-জরিমানা সংক্রান্ত শাস্তির বিধান রয়েছে। (ধারা-৭৫-৮১)

★★★ ৮. কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য শাস্তি
চলচ্চিত্র বিষয়ক কর্মের কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য পাচ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড এবং দুই লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে। চলচ্চিত্র ব্যতিরেকে কোন কর্মের কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য অনুর্ধ্ব চার বছর পর্যন্ত কারাদন্ড এবং ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে। (ধারা-৮২)

★★★ ৯. লঙ্ঘিত অনুলিপি জব্দ করতে পুলিশের ক্ষমতা
সাব-ইন্সপেক্টরের নিম্নতর পদাধিকারী নন এমন যেকোন পুলিশ কর্মকর্তা যদি সন্তষ্ট হন যে, ধারা-৮২ এর অধীনে কোন কম্পিউটার কর্মের কপিরাইট লঙ্ঘনজনিত কোন অপরাধ সংঘটিত হযেছে, হচ্ছে বা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে তবে তিনি গ্রেফতারী পরোয়ানা ছাড়াই কর্মটির সকল অনুলিপি তৈরির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত প্লেট জব্দ করতে পারবেন এবং অনুরূপভাবে জব্দকৃত সকল কপি এবং প্লেট যত দ্রুত সম্ভব একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে উপসস্থাপন করবেন। জব্দকৃত কোন কর্মের অনুলিপি, যন্ত্রপাতি স্বার্থসংশ্লিষ্ট যে কোন ব্যক্তি ১৫ দিনের মধ্যে অনুরূপ অনুলিপি বা যন্ত্রপাতি তাকে ফেরত দেওয়ার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট আবেদন করতে পারবেন এবং ম্যাজিস্ট্রেট বাদীর শুনানি গ্রহনের পর উপযুক্ত আদেশ প্রদান করবেন। (ধারা-৯৩)

★★★ ১০. রেজিস্ট্রার আদেশের বিরুদ্ধে আপীল
রেজিস্ট্রারের কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আদেশে সংক্ষুব্ধ যে কোন ব্যক্তি ঐ সিদ্ধান্ত বা আদেশ প্রদানের তিন মাসের মধ্যে কপিরাইট বোর্ডের নিকট আপীল করতে পারবেন। (ধারা-৯৫)

★★★ ১১. বোর্ডের আদেশের বিরূদ্ধে আপীল
ধারা-৯৫ এর অধীন আপীলে প্রদত্ত কোন সিদ্ধান্ত বা আদেশ ব্যতীত বোর্ডের কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আদেশে সংক্ষুব্ধ কোন ব্যক্তি ঐ সিদ্ধান্ত বা আদেশ প্রদানের তিন মাসের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপীল করতে পারবেন। (ধারা-৯৬)

★★★ ১২. কতিপয় কার্য কপিরাইট লংঘন নয়
গবেষণাসহ ব্যক্তিগত অধ্যয়ন বা ব্যক্তিগত ব্যবহার, বিচারিক কার্যধারার রিপোর্টের উদ্দেশ্যে সাহিত্য, নাট্য, সংগীত ও শিল্পকর্ম পুনরুৎপাদন, জাতীয় সংসদ সচিবালয় কর্তৃক কেবল সংসদ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য পুনরুৎপাদন, শিক্ষক বা ছাত্র কর্তৃক শিক্ষাদান প্রক্রিয়া বা পরীক্ষায় উওর দানের জন্য পুনরুৎপাদন, কোন অপেশাদার ক্লাব বা সমিতি অথবা কোন ধর্মীয়, দাতব্য বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপকারার্থে উপস্থাপন করা হয় এমন কোন সাহিত্য, নাট্যকর্ম, সংগীত বিষয়ক কর্মের সম্পাদনার পুনরুৎপাদন, জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন ব্যতীত সরকারী গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে এমন কোন বিষয় পুনরুৎপাদন, আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্যান্য বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত রায় বা আদেশ পুনরুৎপাদন বা প্রকাশ কপিরাইট লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে না। (ধারা-৭২)



Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন