আয়াতঃ এখন কি অবস্থা?
ডাক্তারঃ হ্যা আবার ঘুমের ইনজেকসন দিয়ে ঘুম পারিয়ে দিয়েছি।
আয়াতঃ আমার কি আসতে হবে?
ডাক্তারঃ না না! কাল সকালে আসলেই হবে?
আয়াতঃ ওকে!
আসলে সেই মেয়েটার হঠাৎ করেই জ্ঞান ফিরে। মেয়েটা নাকি চিৎকার করা শুরু করে। সেখান থেকে পালাতে চেয়েছিলো। কিন্তু নার্স দেখে ফেলে তারপর বহু কষ্টে ডাক্তাররা তাকে ধরে ঘুমের ইনজেকসন দেয়। তারপর ডাক্তার আয়াতকে ফোন করে সব জানায়। আয়াত ফোনটা কেটে নিচে রুমে আসে। এসে তনয়ার ছবির দিকে কতক্ষন তাকিয়ে থেকে বলে-------
আয়াতঃ আচ্ছা তনয়া তুমিইতো বলতে আমারে বুকে মাথা না রাখলে তুমি শান্তিতে ঘুমাতে পারো না। তাহলে আজ এক বছর ধরে তুমি কিভাবে আমাকে ছেড়ে একা শান্তিতে ঘুমাচ্ছ? আজ প্রায় এক বছর আমি শান্তিতে ঘুমাই না। আচ্ছা তনয়া তোমার কি মনে আছে সামনের মাসে আমাদের বিয়ের পুরো দুবছর হবে। তুমি থাকলে প্রথম বারের মত অনেক মজা করতে। তখন কিভাবে আমাকে লুকিয়ে তুমি সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছিলে। আমি করেছিলাম। মজার বিষয় হলো। দুজনেই সেদিন ছাদে গিয়ে সারপ্রাইজ দিতে চেয়ে দুজনেই ধরা পরে অনেক হেসেছিলাম। তুমি আর আমি সেদিন ভালোবাসার ডোরে বেধেঁ ডুব দিয়েছিলাম ভালোবাসার সাগরে। তনয়া আজ আমার ঘুম আসে না। সত্যি বলছি তুমি ছাড়া আমার ঘুম আসে না। ঘুমটা যে বড্ড বেইমান তোমার নিঃশ্বাসের অনুভব ছাড়া সে যে আমার কাছে আসতে চায় না। কেন চলে গেলে তোমার এই সাইকোটাকে ছেড়ে? তুমি কি জানতে না যে তোমার সাইকোটা তোমাকে ছাড়া নরমাল থাকতে পারে না? কিন্তু তনয়া আমার মনটা মানতেই চায়না তুমি নেই। প্রতি মূহুর্তে আমি তোমার হৃদস্পন্দন অনুভব করতে পারি। কোথায় তুমি তনয়া? এভাবে আয়াত রোজ তনয়ার ছবির সাথে কথা বলে কাটিয়ে দেয় রাতের পর রাত।
সকাল দশটার দিকে তনয় আর আয়াত আবার হাসপাতালে মেয়েটিকে দেখতে যায়।
আয়াতঃ ডাক্তার কি অবস্থা ওর?
ডাক্তারঃ হ্যা এখন ঘুমাচ্ছে কিন্তু কাল সারা রাত জ্বালিয়েছে।
তনয়ঃ মানে?
ডাক্তারঃ মানে এত হাই ডোজের ঘুমের ইনজেকসন দেয়ার পরও সে রাতে বার বার ঘুম থেকে উঠে গিয়েছিলো। বুঝতে পারছিলাম না কিভাবে? তারপর ওর ব্লাড টেষ্ট করে যা বুঝলাম তাতে মনে হয় মেয়েটা রোজই এমন ঘুমের ইনজেকসন বা ঔষধ নেয়। যার কারনে মেয়েটার শরীরে এসব ঔষধের প্রতিক্রিয়া কম হয়।
আয়াতঃ কি? কিন্তু মেয়েটাকে দেখলে মনে হয় বয়স তো বিশ একুশ এর উপরে হবে না। এই বয়সি একটা মেয়ে এমন হাই ডোজের ইনজেকসন নেবার কারন?
ডাক্তারঃ এত তাড়াতাড়ি এত অবাক হয়ে না। আরো আছে?
আয়াতঃ আরো কি?
ডাক্তারঃ কাল রাত থেকে মেয়েটার কথাবার্তা থেকে যা বুঝেছি বা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যা জেনেছি তা হলো মেয়েটা মানুষিক ভাবে অসুস্থ। মানে মেয়েটাকে এক কথায় মানুষিক রুগি বলা যায়। ডাক্তারের কথা শুনে আয়াত আর তনয় হা হয়ে গেলো। কারন মেয়েটাকে দেখলে মনে হয় কোন উচ্চা পরিবার থেকে। মানে তার পরনের পোশাক আশাক দেখে তাই বোঝা যায়। কিন্তু মেয়েটা কিনা মানুষিক রুগি!
তনয়ঃ তাহলে এখন কি হবে? মানে মেয়েটার পরিবারের লোককে কিভাবে খুজে বের করবো?
আয়াতঃ সেটাই তো ভাবছি? আচ্ছা ফেইসবুক, পেপারে আর টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দিলে কেমন হবে?
তনয়ঃ ঠিক বলছো! মেয়েটার কয়েকটা পিক তুলে এমনটা করলে হয়তো ওর পরিবারের কেউ দেখবে।
তারপর আয়াত আর তনয় ছবি তোলার জন্য কেবিনে যায়। আয়াত মেয়েটার ছবি তোলার সময় বার বার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ভাবে। কে ও? আমার মনে হচ্ছে আমি মেয়েটাকে চিনি। কিন্তু মনে আসছে না। কোথাওতো নিশ্চই মেয়েটাকে দেখেছি। কিন্তু কোথায়? তারপর ছবি তুলে কিছু ছবি ফেইসবুকে আপলোড করে। আর তনয় খবরের কাগজে দেবার কথা বলে।
কিছুক্ষন পর মেয়েটা ঘুম ভাঙে। তখন আয়াত আর আনিকা কেবিনে ছিলো। আনিকাকে তনয় ফোন করে ডাকে। কারন হাসপাতালে মেয়েটার পাশে একটা মানুষ থাকা দরকার। আর তনয় আর আয়াত পুরুষ মানুষ হয়ে কিভাবে থাকবে? তাই আনিকাকে নিয়ে আসা হলো। মেয়েটা চোখ খুলেই আয়াতের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে খাট থেকে নেমে আয়াতকে জড়িয়ে ধরে। আয়াত হতভম্ব হয়ে যায়। মেয়েটা আয়াতে জড়িয়ে ধরে বলছে-------
মেয়েটিঃ আয়াত ভাইয়া এত দিন কোথায় ছিলে? আমি তোমায় কত খুজেছি। কোথায় ছিলে?
আয়াত আর আনিকা মেয়েটার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যায়। আর আয়াত আনিকাকে বলছে এসব কি বলছে মেয়েটা? মেয়েটা কে? আর আমার নাম কিভাবে জানে?
আনিকাঃ ভাইয়া তুই চিনিস মেয়েটাকে?
আয়াত মেয়েটাকে নিজের থেকে জোড় করে ছাড়িয়ে বললো না? কে ও? আয়াত শান্ত হয়ে মেয়েটাকে বসিয়ে বললো
আয়াতঃ তোমার নাম কি?
মেয়েটিঃ আয়াত ভাইয়া কেমন কথা বলেন? আমি? আপনি আমায় চেনেন না?
আয়াতঃ ঠিক আছে তোমার বাড়ি কোথায়?
কিন্তু আফসোস মেয়েটি তার ঠিকানা বলতে পারছে না। আয়াত আর আনিকা মেয়েটাকে বিভিন্ন ভাবে বুঝিয়ে বাইরে বের হয়ে বলে---
আনিকাঃ ভাইয়া সত্যিই তুই মেয়েটাকে চিনিস না?
আয়াতঃ অনি সত্যি আমি মেয়েটাকে চিন্তে পারছি না। তবে হ্যা আমার মনে হয় আমি মেয়েটাকে কোথাও তো দেখেছি। কিন্তু মনে পড়ছে না? কোথায়? বা কে মেয়েটি।?
আনিকঃ ভাইয়া মনে করার চেষ্টা কর। আয়াত শত চেষ্টা করেও মনে করতে পারছে না। পরে আয়াত আনিকাকে মেয়েটার পাশে থাকতে বলে অফিসে চলে যায়। অফিসে বসে বারবার মেয়েটার কথা ভাবতে ছিলো। কে মেয়েটা? আয়াতকে কিভাবে চেনে ? এরকম আরো কথা। আজ অফিস থেকে তারাতারিই বেড় হয় মানে বিকালে বেলাই হাসপাতালে উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। পথে জ্যামে আটকা পড়ে। জ্যামের মধ্যে রিকশায় বসা একটা মহিলার দিকে তাকিয়ে আয়াতের চোখ আটকে গেলো। কারন মহিলাটি গত কালের সেই মহিলা ছিলো যার কাছে তনয়ার পিক ছিলো। আয়াত বুদ্ধি করে আজকে আর মহিলাকে ডাক না দিয়ে তার পিছু নিলো। মহিলাটি একজায়গায় রিকাশা থামিয়ে ভিতরের দিকে হাটা দিলো। আয়াতও গাড়ি সাইড করে রেখে তার পিছু পিছু গেলো। হঠাৎ করে মহিলা চোখের আড়াল হয়ে গেলো।
আয়াতঃ সিট! আজও হারিয়ে ফেললাম বোধয়। আয়াত তারপরও আশেপাশে খুজতে লাগলো। আয়াত আবার মহিলাকে পেলো। দেখলো মহিলাটি ফোনে কথা বলতে ছিলো । আয়াত আড়ালে দাড়িয়ে মহিলাটির কথা শুনতে চেষ্টা করে কিন্তু ফোনে যার সাথে কথা বলছিলো তার কথা গুলো শোনা যাচ্ছিলো না। মহিলাটির কথাগুলো ছিলো এরকম---
মহিলাঃ হ্যালো। আয়াত আজকে আবার আমার পিছু নিয়েছে। এখন কি করবো?
--------
মহিলাঃ আয়াত যদি আমায় ধরে ফেলে তখন কি করবো? দেখো আমি যদি ফেসে যাই তনয়ার বিষয়ে সব সত্যি কথা আমি আয়াতকে বলে দেবো। আর তোমারও।
----------
ঠিক আছে। ওকে বাই।
আয়াত ভাবছে মহিলা তনয়ার বিষয় কি সত্যি জানে? আর ফোনের ওপারেই বা কে? আমাকে জানতেই হবে। আয়াত মহিলাটিকে ধরার জন্য আড়াল থেকে বের হয়। কিন্তু আফসুস মহিলাটি কোথায় যেনো লুকিয়ে পড়ে। তারপর অনেক খুজেও আয়াত মহিলাটিকে পেলো না। নিরাশ হয়ে আয়াত হাসপাতালে না গিয়ে বাড়ি চলে গেলো। আনিকাকে ফোন দিয়ে বললো সে যেনো মেয়েটির খেয়াল রাখে। বাড়ি এসে বার বার মহিলার কথা ভাবতেছিলো।
আয়াত ভাবছে আচ্ছা যদি এমন হতো যে তনয়া বেঁচে আছে? একটা নাটকিয় দৃশ্যের মত আমার সামনে আসতো। একবার যদি তনয়াকে আবার পেতাম। বুকের মাঝে এমন করে আগলে রাখতাম যে, আল্লাহ ব্যতিত পৃথিবীর কোন শক্তি আমার থেকে তনয়াকে আর দূরে করতে পারতো না। সবাই মেনে নিয়েছে যে তনয়া মারা গেছে । কিন্তু আমার মনটা কিছুতেই তা মানতে পারছে না। কেন যেনো আল্লাহর উপর খুব ভরশা হচ্ছে। মনে হচ্ছে তিনি কোন জাদু করবে। কোন অজানা শক্তি দিয়ে তিনি আমার তনয়াকে আবার আমার কাছে ফিরিয়ে দিবে। মনের মাঝে কোথায় যেনো ছোট্ট একটা আশার প্রদিপ টিপ টিপ করে জ্বলছে। মনে হচ্ছে শত চেষ্টা করলেও প্রদিপটা নিভবে না। মিস ইউ তনয়া। লাভ ইউ এ লট।
কেউ মানুক না মানুক আমি জানি তুমি আছো। কারন তুমি না থাকলে তোমার হৃদস্পন্দন চালু না থাকলে আমার হৃদস্পদন চালু থাকতো না। আমরা যে একে অপরের নিঃশ্বাসে মিশে গেছি। আমি তোমার হৃদয়ের আওয়াজ অনুভব করতে পারি। শুনতে পারি তোমার হৃদয়ের ডাক। কিন্তু কেন যেনো তোমার কাছে যেতে পারি না? কোন এক অশুভ শক্তি আমাকে তোমার কাছ যেতে দিচ্ছে না। হেই তনয়া আমি জানি তুমিও আমার কাছে আসতে চাও কিন্তু তোমাকেও সেই অশুভ শক্তি আটকে রেখেছে। চিন্তা করো না তনয়া। আমার মন যখন একবার টান দিয়েছে মানে আমার মন এটাই বলছে তুমি আমার আশে পাশেই কোথাও আছো। তুমিতো বলতে মনের টান বড় টান। সেই মনের টানে আমার ভালোবাসার টানে আর আল্লাহর রহমতে তোমায় আমি ফিরিয়ে আনবোই। তারপর আয়াত কাকে যেনো ফোন করলো আর বললো
আয়াতঃ যত তারাতাড়ি সম্ভব আমার এ ইনফরমেশন গুলো চাই। তা যেভাবেই হোক। তার জন্য যা লাগে তাই করবি। সময় এসেছে প্রায় এক বছর পিছনে ফিরে যাবার। এক বছর পিছনে গিয়ে জানার সেদিন আসলে কি হয়েছিলো? তনয়ার মৃত্যুর কারনে আমি এতটা ভেঙে পরেছিলাম যে, সেই বিষয়টার কথা খেয়ালই ছিলো না। আর অন্যেরা যা বলেছে তাই মেনে নিয়েছি। কিন্তু নাহ এখন সময় এসেছে সব সত্যিটা জানার। এখন না জানলে আর কখন? এতদিন মিথ্যা মরিচিকার পিছনে ছুটেছি। যে যা বলেছে বিশ্বাস করেছি। কিন্তু আর না! এখন সম্পূর্ন সত্যিটা যেটা চাপা পড়ে গিয়েছিলো তনয়ার মৃত্যুর সাথে সেটাকে আবার টেনে উপরে তুলতে হবে। তুই প্লিজ হেল্প কর ভাই। তুই ছাড়া আর কাউকে যে আর ভরশা পাচ্ছি না।
-------ঠিক আছে। তুই চিন্তা করিস না। আমাকে কয়েকটা দিন সময় দে।
আয়াতঃ ওকে। বাই। আয়াত ফোনটা রেখে তনয়ার ছবির দিকে তাকিয়ে বললো তনয়া আমি হৃদয়ের টান যদি সঠিক হয়। তাহলে খুব শিগ্রই সব রহস্যের পর্দা ফাস হবে। তোমাকে ফিরে পাবো কিনা জানি না তবে মনের ভিতর কেমন যেনো করছে? যদি আল্লাহ কোন মিরাক্কেল করে বসে। রাতটা বিভিন্ন জনকে ফোন করে আর পুরোনো কিছু হিসাব মেলাতে মেলাতেই শেষ হলো।
পরের দিন সকালবেলা আয়াতের ফোনে তনয়ের ফোন আসলো।
আয়াতঃ হ্যা তনয় বলো?
তনয়ঃ আয়াত মেয়েটার পরিবারের খোজ পাওয়া গেছে।
আয়াতঃ সত্যি! কিন্তু কিভাবে?
তনয়ঃ আমি মেয়েটার বিষয়ে সব কিছু লিখে ছবি সহ পোস্ট করে গ্রুপে দিয়েছিলাম। সেখান থেকেই একজন চিনতে পারে। সেই আমার সাথে যোগাযোগ করলো। কিছুক্ষনের মধ্যে তারা হাসপাতালে পৌছাবে। তুমিও চলে আসো।
আয়াতঃ ঠিক আছে।
আয়াত তারাতাড়ি হাসপাতালে পৌছালো। মেয়েটাকে নিতে তার বাবা মা এলো। কিন্তু মেয়েটা আয়াতকে ছেড়ে যেতে চাইছে না। আর আয়াত মেয়েটার বাবা মাকে দেখে থ হয়ে গেলো। মেয়েটাকে চিনতে ওর এখন আর একটুও কষ্ট হলো না। মেয়েটা আয়াতের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। আয়াত মেয়েটার হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। তখনই কে যেনো বলে উঠলো
---------হাতটা ছাড়ো।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন