----------আয়াত বিস্ময়ের চোখে তইকয়ে আছে সামনে দাড়ানো লোকটার দিকে।
কারন লোকটা আর কেউ নয় নীল মানে রাহাত। আজ প্রায় দু বছর পর নীলকে দেখলো আয়াত।
রাহাতঃ রিমু (মেয়েটি) আমার কাছে আসো?
আয়াতঃ তুই? তুই এখানে কি করছিস?
রাহাতঃ রিমু আমার ছোট বোন।
এবার আয়াত বুঝতে পারলো মেয়েটিকে ওর এত চেনা চেনা কেনো লাগছিলো। কারন আয়াত বেশ কয়েকবার রাহাতের বাসায় গিয়েছিলো। তখন রিমুকে কয়েকবার দেখেছিলো। কিন্তু আয়াত শুনেছিলো গত বছর চারেক আগে রিমু পড়া শোনার জন্য বিদেশে চলে গিয়েছিলো। কিন্তু সেই রিমুর এ অবস্থা কেন? আয়াত রিমুকে ছোট বোনের মত দেখতো। কিন্তু অনেক বছর ধরে রিমুর সাথে কোন কথা হয়নি আর গত দুবছর ধরে রাহাতের প্রতি ঘৃনায় আয়াতের মাথা থেকে রিমুর নামটা বের হয়ে গিয়েছিলো।
আয়াতঃ কিন্তু রিমুর এ অবস্থা কেন?
রাহাতঃ সেটা তোর না জানলেও চলবে? চলো রিমু।
রিমুঃ নাহ আমি আয়াত ভাইয়ার সাথে গল্প করবো।
রাহাতঃ প্লিজ লক্ষি বোন আমার চলো। আয়াত ভাইয়া কালকে আমাদের বাসায় আসবে!
রিমুঃ সত্যি আসবে তো?
রাহাতঃ হুমম।
রাহাতের বাবাঃ আসলে দুদিন আগে রিমু হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায়। আমরা অনেক খুজেছি কিন্তু পাইনি। শেষে আমাদের এক আত্নীয় ফেইসবুকে ওর ছবি দেখে চিনতে পারে।
আয়াতঃ আঙ্কেল রিমুর এ অবস্থা কিভাবে হলো?
রাহাতের বাবাঃ আমরাও ঠিক জানি না গত দু আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে ওর এমন অবস্থা।
আয়াতঃ ওহ।
রাহাতের বাবা মা রিমুকে নিয়ে চলে যাচ্ছে।
রাহাতঃ ধন্যবাদ।
আয়াতঃ তার প্রয়োজন নেই। একটা কথা কি জানিস রাহাত? পাঁপ বাপকেও ছাড়ে না। তোর পাঁপের ভার হয়তো তোর নিঃষ্পাপ বোনটাকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
রাহাত চলে গেলো। আয়াত ভাবছে আইনের হাত থেকে ছাড়া পেলেও তোর পাঁপের শাস্তি উপরওয়ালা ঠিকই দিবে। সেদিন আয়াত আর তনয়ার মাঝে সব ঠিক হবার পর। আয়াত আর তনয়া কিছুদিন পর সিলেট যায়। তারপর সব প্রমান সহ রাহাতকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়। ধোকাদারি আর আয়াতকে সুইসাইড করতে বাধ্য করায়। সব মিলিয়ে দু বছরের সাজা হয়েছিলো কিন্তু পরে টাকার জোড়ে তাড়াতাড়ি বের হয়ে যায়। আয়াত পরে আবার কেস রিওপেন করতে চাইলে তনয়া বলে থাক ওকে মাফ করে দাও। ওর বাকি শাস্তি আল্লাহ দিবে।
হাসপাতাল থেকে বের হয়ে তনয় আর আয়াত যে যার কাজে লেগে পরে। আয়াত নিজের সব কাজ শেষ করে বাসায় ফিরছিলো। দেখলো রাস্তার মাঝে প্রচন্ড ভির। আয়াত একটা লোককে জিগেস করলো কি হয়েছে ভাই? লোকটি বললো সামনে একটা গাড়ি একসিডেন্ট হয়েছে। একটা মেয়ে। স্পট ডেড। লোকটা বললো মেয়েরা কেনো যে গাড়ি নিয়ে পথে বের হয় আল্লাই জানে? একসিডেন্ট এর কথা শুনতেই আয়াতের বুকটা কেঁপে ওঠে। এক বছর আগে এ রকমই এক কার একসিডেন্ট এর কারনে তার তনয়া তার থেকে দূরে চলে গেছে। আয়াত নিজে নিজে বলছে মনে হয় আবার এক আয়াত তৈরী হতে যাচ্ছে। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে গাড়িতে রাখা তনয়ার ছবির দিকে তাকিয়ে বললো। সেদিন যদি তোমায় আমি গাড়ি নিয়ে বের হতে নিষেধ করতাম তাহলে হয়তো আজ তুমি আমার কাছে থাকতে।
তনয়ার একসিডেন্টের এর কয়েকদিন আগে আয়াতের সাথে ঝগরা হয়েছিলো। কি বিষয় নিয়ে জানেন? তনয়া আয়াতকে বলেছিলো আচ্ছা আয়াত আমি তোমার কাছে না থাকলে তুমি কি করবে? আয়াত তনয়ার কথা শুনে প্রচন্ড রাগ করেছিলো। সারাদিন তনয়ার সাথে কোন কথাই বলেনি। আয়াতের রাগ ভাঙাতে তনয়ার যে সেদিন কি কি করা লাগছে তা কেবল তনয়াই জানে। তারপর কয়েকদিন তনয়া এমন কথা বলেনি। কিন্তু তনয়ার মনটা সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতো। সবসময় মনে হতো এই বুঝি আয়াতের থেকে দূরে চলে যাবে। প্রচন্ড ভয় করতো। আয়াত বুঝতে পারতো তনয়া কোন বিষয় নিয়ে প্রচন্ড চিন্তায় আছে একদিন আয়াত তনয়াকে নিজের সামনে বসিয়ে তনয়ার হাত দুটো ধরে বললো
আয়াতঃ কি হয়েছে লক্ষি? কদিন ধরে দেখছি তুমি খুব অস্থিরতার মধ্যে আছো? কি হয়েছে? বলো আমায়? আমি আর তুমি মিলে সব অস্থিরতা দূরে করে দিবো। বলো?
তনয়াঃ কদিন ধরে খুব বাজে স্বপ্ন দেখছি।
আয়াতঃ কি স্বপ্ন?
তনয়াঃ সবসময় দেখি কে যেনো আমার থেকে তোমাকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তোমার কাছে যাবার চেষ্টা করছি কিন্তু কেউ যেতে দিচ্ছে না।
আয়াতঃ (হাসি দিয়ে) সারাদিন উল্টা পাল্টা সিরিয়াল দেখো আর রাতে সেটা মাথায় ঘুরে।
তনয়াঃ কি? আমি সিরিয়াল দেখি?
আয়াতঃ দেখোই তো। উল্টা পাল্টা প্যাচ ওয়ালা সিরিয়াল দেখো।
তনয়াঃ কি? দাড়াও তোমার হচ্ছে!
আয়াত তনয়াকে টান দিয়ে নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরে বলে
আয়াতঃ এই পাগলি আল্লাহ ব্যাতিত তোমাকে কেউ আমার কাছ থেকে দূর করতে পারবে না।
তনয়া অনেক শক্ত করে আয়াতকে জড়িয়ে ধরলো। আর বললো----
তনয়াঃ তাই যেনো হয়! আমায় তোমার বুকের মাঝে শক্ত করে মনের বাধঁনে বেঁধে রাখো।
আয়াতঃ তাইতো রেখেছি ডিয়ার।
একসিডেন্ট এর আগের দিন তনয়ার মনটা কেমন যেনো করতে ছিলো। তাই তনয়া আয়াতের জন্য সুন্দর একটা সারপ্রাইজ প্ল্যান করে। নিজের রুমটাকে সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজায়। বিছানায় অসংখ্য গোলাপের পাপরি বিছিয়ে দেয়। আয়াত অফিস থেকে এসে রুমে ডুকতে গেলে তনয়া ডুকতে দেয়না। বলে খেয়ে তারপর ডুকবে এর আগে পারবে না।
আয়াতঃ কেনো?
তনয়াঃ রুমে মশা মারার স্প্রে করেছি। এখন ডুকলে তোমার সমস্যা করবে।
আয়াতঃ এ্যা
তনয়াঃ যাও ফুটো।
আয়াত মুখ ভার করে চলে যায়। খাবার খেয়ে রুমে ডুকেতো আয়াত হা হয়ে গেছে। রুমটা ফুল আর মোমবাতি দিয়ে অসম্ভব সুন্দর করে সাজানো। আর সব থেকে অবাক হয়েছে তনয়াকে দেখে। তনয়া হালকা মিষ্টি কালারের একটা শাড়ি পড়া। খুব সুন্দর করে সেঁজেছে। যে কেউই ওর রুপের মায়ায় পরে যাবে। আয়াত হা হয়ে তনয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক পড়ছে না।
তনয়াঃ মুখ বন্ধ করো মশা ডুকে যাবে।
আয়াত তনয়াকে টান দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে বলে
আয়াতঃ কেন তুমি না মশার স্প্রে করছো? তাহলে মশা কোথা থেকে আসবে?
তনয়া আয়াতকে চিমটি কাটলো।
আয়াতঃ উহ
তনয়াঃ কি হলো হ্যাজবেন্ড? মশা কামরেছে বুঝি? কিভাবে?
আয়াত দুষ্টমি হাসি দিয়ে তনয়ার কোমরে একটা চিমটি কেটে।
আয়াতঃ এভাবে!
তনয়াঃ ঠিক হলো না কিন্তু!
আয়াত তনয়ার কোমর ধরে আরো কাছে টেনে তাহলে এখন একটু ঠিক কাজ করি।
তনয়াঃ আচ্ছা কি সে ঠিক কাজ?
আয়াত তনয়াকে আর কিছু বলার চান্স দিলো না।
তনয়া আয়াতের বুকে শুয়ে আছে।
আয়াতঃ তা আজকে এসব প্ল্যান করার মানে কি ম্যাডম?
তনয়াঃ এমনিই তোমাকে ভালোবাসতে ইচ্ছা হলো তাই।
আয়াতঃ আচ্ছা! তো আরেকটু ভালোবাসি তাহলে।
সেদিনের সকালটা খুব সুন্দর ছিলো। নামাজ পড়ে সকালের মিষ্টি রোদে বসে দুজন চা খেলো। গল্প করলো। আয়াত যখন অফিস যাচ্ছিলো। তখন আয়াতকে ডাক দিয়ে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঠোটে ভালোবাসার পরশ দিয়ে বললো তাড়াতাড়ি এসো। আয়াত তনয়ার কপালে ভালোবাসার পরশ দিয়ে বলেছিলো ঠিক আছে। কে জানতো সেটা তাদের শেষ বারের মত জড়িয়ে ধরা ছিলো।
সকাল এগারোটার দিকে আয়াত তনয়াকে ফোন করে।
আয়াতঃ আমার লক্ষিটা কি করে?
তনয়াঃ তোমার লক্ষিটা এখন তার বাবার বাসায় যাবে। মা ফোন করেছিলো। কি যেনো কাজ আছে। তুমি কিন্তু সন্ধ্যা বেলা আমায় নিয়ে যাবে। (ওহ বলাই হয়নি রাহাতের জেল হবার পর আয়াত আর তনয়া নিজেদের শহরে চলে আসে কারন তনয়া সবসময় আয়াতের বাবা মায়ের সাথে থাকতে চাইতো। আর আয়াতদের বাড়ি থেকে তনয়াদের বাড়ি যেতে আধা ঘন্টার মত লাগে।)
আয়াতঃ ওকে সুইট হার্ট। তবে সাবধানে যেও।
তনয়াঃ ঠিক আছে।
কিছুক্ষন পর তনয়া আয়াতকে ফোন করলো
আয়াতঃ হ্যা বলো।
তনয়াঃ আয়াত পাঁচ মিনিট পর নিচে নেমো তো। তোমার নীল রঙের ফাইলটা ভুলে বাসায় ফেলে গেছো।
আয়াতঃ ও হ্যা। ধন্যবাদ
তনয়াঃ আই লাভ ইউ।
আয়াত আই লাভ ইউ টু বলতে যাবে এর মধ্যে প্রচন্ড জোড়ে ধাক্কার শব্দ হলো। আয়াত স্তব্দ হয়ে গেলো। তনয়া তনয়া বলে চিৎকার করতে লাগলো। কিন্তু তনয়ার কোন শব্দ পেলো না।
কিছুক্ষন পর আয়াত সহ পরিবারের সবাই অপারেশন থিয়েটারের বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলো। আয়াত সহ সবাই প্রচন্ড কান্না করতে ছিলো। কয়েক ঘন্টা অপারেশনের পর ডাক্তার বের হলো।
ডাক্তারঃ দেখুন এখন হঠাৎ করে ওনার জ্ঞান ফিরেছে আমরা বুঝতে পারছি না কিভাবে ? ওনি বার বার আয়াতকে ডাকছে। আয়াত দৌড়ে তনয়া কাছে গেলো।
তনয়াঃ মিঃ সাইকো বলেছিলাম না আমার মনটা কু ডাক ডাকছে। দেখলে তো কি হলো?
আয়াতঃ তোমার কিছু হবে না। চুপ করো। (ভিষন কান্না করে)
তনয়াঃ একটু বলি। তনয়ার ভিষন কষ্ট হচ্ছে তবুও বলছে তুমি নিজের খেয়াল রেখো। পরিবারের সবার খেয়াল রাখবে। আবার যেনো সাইকো হয়ে যেও না? ওহ হ্যা আমার ফুলে গাছ গুলোর খেয়াল রাখবে। আর এখন আমায় একটু তোমার বুকে নাও।
আয়াত খুব সাবধানে তনয়ার মাথাটা উঠিয়ে বুকের সাথে আলতো করে চেপে ধরলো।
তনয়াঃ আই লাভ ইউ আয়াত।
আয়াতঃ আই লাভ ইউ টু তনয়া। তনয়া! তনয়া! ডাক্তার ডাক্তার বলে তনয়া চিৎকার করতে ছিলো।
ডাক্তাররা এসে পরিক্ষা করে বললো সি ইজ গোয়িং টু ডিপ কোমা। আয়াত সহ সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলো।
আয়াতঃ তনয়া ঠিক হবে কবে?
ডাক্তারঃ তা বলা মুশকিল। কয়েক মাসও লাগতে পারে আবার বছরও ।
টানা তিনমাস মৃত্যুর সাথে লড়েছে তনয়া কিন্তু পেরে উঠতে পারে নি।
হঠাৎ পিছনে গাড়ির পো পো শব্দে আয়াতের ধ্যান ভাঙলো। আয়াত গাড়ি চালাচ্ছে আর বলছে
আয়াতঃ তুমি আছো তনয়া। তুমি আছো।
কয়েকদিন পর---------
আজ আয়াতদের আর তনয়াদের দুই পরিবারের লোক ভিষন খুশি কারন আনিকা মা হতে চলেছে। সবাই বিষটা নিয়ে ভিষন আনন্দিত। আনিকাকে দেখতে একজন মহিলা ডাক্তার আসলো। তিনি সারা বাড়িতে বিভিন্ন জায়গায় তনয়ার ছবি দেখে জানতে চায় কে?
আনিকাঃ আমার ভাবি আবার ননদ। বছর খানিক আগে গত হয়েছেন।
ডাক্তারঃ হোয়াট?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন