মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা:) এর বাণী পর্ব ১১

মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা:) এর বাণী ২০১ থেকে ২২০

 

তাওবা:

(২০১) বান্দাহ যখন অপরাধ স্বীকার করে এবং তাওবা করে, তখন আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন। (সহীহ বুখারী)

ব্যাখ্যা: তাওবা মানে ফিরে আসা। তাওবা করার অর্থ – অন্যায়, অপরাধ ও ভুল হয়ে গেলে তা স্বীকার করে সে জন্যে অনুশোচনা করা ও তা থেকে, ফিরে আসা এবং এমন কাজ আর কখনো না করার সিদ্ধান্ত নেয়া।

(২০২) সব আদম সন্তানই ভুল করে। তবে এদের মধ্যে উত্তম হলো তারা যারা ভুলের জন্যে তাওবা করে। (তিরমিযী)

রসূলুল্লাহর কতিপয় দু’আ:

(২০৩) হে আল্লাহ ! আমি তোমার কাছে পানাহ চাই দুশ্চিন্তা থেকে, মনোকষ্ট থেকে, বার্ধক্য থেকে, আলস্য ও কাপুরুষতা থেকে এবং কৃপণতা ও ঋণের বোঝা থেকে। (সহীহ বুখারী)

(২০৪) হে আল্লাহ ! আমার অন্তরে আল্লাহভীতি দাও এবং তাকে পরিশুদ্ধ করো। তুমিই তো তার উত্তম পরিশুদ্ধকারী। (সহীহ মুসলিম)

(২০৫) ওগো আল্লাহ ! আমি তোমার কাছে এমন জ্ঞান থেকে পানাহ চাই যাতে কোনো কল্যাণ নেই। আর এমন হৃদয় থেকেও আশ্রয় চাই যাতে তোমার ভয় নেই। (আহমদ)

(২০৬) আয় আল্লাহ ! আমি তোমার কাছে পানাহ চাই সংশয় থেকে, কপটতা থেকে আর অসৎ চরিত্র থেকে। (নাসায়ী)

(২০৭) হে আল্লাহ ! আমি তোমার কাছে চাই হিদায়াত, আল্লাহভীতি, পবিত্র জীবন এবং প্রাচুর্য। (সহীহ মুসলিম)

(২০৮) ওগো আল্লাহ ! আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমার প্রতি দয়া করো, আমাকে সঠিক পথ দেখাও, আমাকে স্বস্তি দান করো এবং আমাকে জীবিকা দাও। (সহীহ মুসলিম)

(২০৯) আমার আল্লাহ ! আমি তোমার কাছে কল্যাণময় জ্ঞান, গ্রহণযোগ্য আমল আর পবিত্র জীবিকা। (আহমদ]

(২১০) ওগো আল্লাহ ! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি সুস্থতা, স্বস্তি, বিশ্বস্ততা, উত্তম চরিত্র আর তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্টি। (বায়হাকী)

(২১১) আমার আল্লাহ ! আমি তোমার ভালোবাসা চাই, আর যে তোমাকে ভালোবাসে তার ভালোবাসা চাই। (তিরমিযী)

জীবন পথের আলো:

(২১২) আবু যর (রা) বলেন, আমি নিবেদন করলাম,ওগো আল্লাহ রসূল আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেনঃ আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি আল্লাহকে ভয় করবার।

কারণ এটাই তোমার সমস্ত কাজকে সৌন্দর্য দান করবে।

আমি বললাম, আমাকে আরো উপদেশ দিন।

তিনি বললেন : কুরআন পাঠ এবং আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর বিষয়ে আলোচনাকে নিজের কর্তব্য কাজ বানিয়ে নাও। এতে আকাশে তোমায় নিয়ে আলোচনা হবে আর এটা

পৃথিবীতে তোমার পথের আলো হবে।

আমি বললাম, আমাকে আরো উপদেশ দিন।

তিনি বললেন : বেশী সময় নীরব থাকবে, কম কথা বলবে। এটা শয়তানকে তাড়াবার হাতিয়ার হবে এবং তোমার দীনের কাজের সহায়ক হবে।

আমি আরয করলাম, আমাকে আরো আদেশ দিন।

তিনি বললেন তিক্ত হলেও সত্য কথা বলবে।

আমি নিবেদন করলাম, আমাকে আরো উপদেশ দিন।

তিনি বললেন : ইসলামী আন্দোলন ( জিহাদ ) করাকে নিজের কর্তব্য বানিয়ে নাও। কারণ এটাই মুসলমানদের বৈরাগ্য।

আমি বললাম, আমাকে আরো কিছু বলুন।

তিনি বললেন : দরিদ্র লোকদের ভালোবাসবে এবং তাদের সাথে উঠাবসা করবে।

আমি বললাম, আমাকে আরো উপদেশ দিন।

তিনি বললেন : তোমার নিজের মধ্যে যেসব দোষ ত্রুটি আছে, সেগুলোর দিকে তাকাও। অন্যের মধ্যে যে দোষ ত্রুটি আছে তা খুজে বেড়ানো এবং বলে বেড়ানো থেকে বিরত থাকো।

অতপর তিনি আমার বুকে হাত মেরে বললেন, আবু যর ! কর্মকৌশল ও কর্মপ্রচেষ্টার চাইতে বড় বুদ্ধিমত্তা আর নেই। হারাম ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার চেয়ে বড় বীরত্ব কিছু নেই। আর সুন্দর ব্যবহারের চাইতে বড় কোনো ভদ্রতা নেই। (ইবনে হিব্বান)

সঠিক পথে চলো

( ২১৩) আমার প্রভু আমাকে নয়টি নির্দেশ দিয়েছেন। সেগুলো হলো :

- গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করতে,

- সন্তুষ্টি এবং অসন্তুষ্টি উভয় অবস্থাতে ন্যায় কথা বলতে,

- দারিদ্র ও প্রাচুর্য উভয় অবস্থাতে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে,

- যে আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে,

- তার সাথে সম্পর্ক জুড়তে,

- যে আমাকে বঞ্চিত করে,

- তাকে দান করতে,

- যে আমার প্রতি অবিচার করে,

- তাকে ক্ষমা করে দিতে,

- আমার নীরবতা যেনো চিন্তা গবেষণায় কাটে,

- আমার কথাবার্তা যেনো হয় উপদেশমূলক,

- আমার প্রতিটি দৃষ্টি যেনো হয় শিক্ষা গ্রহণকারী।

এ ছাড়া ও আমার প্রভু আমাকে আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছেন, সেগুলো হলো :

আমি যেনো ভালো কাজের আদেশ করি এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করি। (সহীহ বুখারী)

( ২১৪) আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হারিস ইবনু হিশাম (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনার প্রতি ওহী কিভাবে আসে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কোন সময় তা ঘন্টাধ্বনির ন্যায় আমার নিকট আসে।

আর এটি-ই আমার উপর সবচাইতে কষ্টদায়ক হয় এবং তা সমাপ্ত হতেই ফিরিশতা যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে নিই, আবার কখনো ফিরিশতা মানুষের আকৃতিতে আমার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে ফেলি। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি প্রচন্ড শীতের দিনে ওহী নাযিলরত অবস্থায় তাঁকে দেখেছি। ওহী শেষ হলেই তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়ত।

( ২১৫) কুতায়বা ইবনু সা’ঈদ (রহঃ) ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বললেনঃ গাছপালার মধ্যে এমন একটি গাছ আছে যার পাতা ঝরে না। আর তা মুসলিমের উপমা। তোমরা আমাকে বল, ‘সেটি কি গাছ?’ রাবী বলেন, তখন লোকেরা জঙ্গলের বিভিন্ন গাছ-পালার নাম চিন্তা করতে লাগল। আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, ‘আমার মনে হল, সেটা হবে খেজুর গাছ। ’ কিন্তু আমি তা বলতে লজ্জাবোধ করছিলাম। তারপর সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) বললেন, ‘ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি আমাদের বলে দিন সেটি কি গাছ? তিনি বললেনঃ তা হল খেজুর গাছ। ’

(২১৬) বোখারী শরীফ হাদীস ১। হুমায়দী (রহঃ) আলকামা ইবনু ওয়াক্কাস আল-লায়সী (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছিঃ আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ প্রত্যেক কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে দুনিয়া লাভের অথবা নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে- সেই উদ্দেশ্যেই হবে তার হিজরতের প্রাপ্য।

(২১৭) মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রহঃ) থেকে বর্ণিত, মহান আল্লাহর বাণীঃ তাড়াতাড়ি ওহী আয়ত্ত করার জন্য আপনার জিহ্বা তার সাথে নাড়বেন না’ (৭৫:১৬) এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহী নাযিলের সময় তা আয়ত্ত করতে বেশ কষ্ট স্বীকার করতেন এবং প্রায়ই তিনি তাঁর উভয় ঠোঁট নাড়াতেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি তোমাকে দেখানোর জন্য ঠোঁট দুটি নাড়ছি যেভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাড়াতেন। ’সা’ঈদ (রহঃ) (তাঁর শাগরিদদের) বললেন, আমি ইবনু’আব্বাস (রাঃ)-কে যেভাবে তাঁর ঠোঁট দুটি নাড়াতে দেখেছি, সেভাবেই আমার ঠোঁট দুটি নাড়াচ্ছি। ’ এই বলে তিনি তাঁর ঠোঁট দুটি নাড়ালেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা নাযিল করলেনঃ “তাড়াতাড়ি ওহী আয়ত্ত করার জন্য আপনি আপনার জিহবা তার সাথে নাড়াবেন না। এর সংরক্ষণ ও পাঠ করানোর দায়িত্ব আমারই। ”

(৭৫:১৬-১৮) ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন এর অর্থ হলঃ আপনার অন্তরে তা সংরক্ষণ করা এবং আপনার দ্বারা তা পাঠ করানো। সুতরাং যখন আমি তা পাঠ করি আপনি সে পাঠের অনুসরণ করুন (৭৫:১৯) ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন অর্থাৎ মনোযোগ সহকারে শুনুন এবং চুপ থাকুন। এরপর এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্ব আমারই (৭৫:১৯)। ’ অর্থাৎ আপনি তা পাঠ করবেন এটাও আমার দায়িত্ব। তারপর যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসতেন, তখন তিনি মনোযোগ সহকারে কেবল শুনতেন। জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম চলে গেলে তিনি যেমন পড়েছিলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ঠিক তেমনি পড়তেন।

(২১৮) বিশ্বনবী (সা)) বললেন : তোমরা নিজেদেরকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা কর, যদিও তা সম্ভব হয় একটি মাত্র খুরমার অর্ধেক অংশ কিংবা তাও যদি না থাকে তাহলে সামান্য পানি অন্য রোজাদারকে ইফতার হিসেবে আপ্যায়নের মাধ্যমে।

(২১৯) তোমরা অনুমান বা সন্দেহ পোষন হতে সবধান থাক। কেননা অনুমান সবচেয়ে বড় মিথ্যা।

(২২০) অহংকার, প্রতারণা ও ঋণমুক্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা বেহেশতবাসী হবার একটি শর্ত।



Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন