তিতুমীর ১৭৮২ সালে ২৪ পরগনা জেলার বশিরহাট মহকুমার চাঁদপুর (মতান্তরে হায়দরপুর গ্রামে)জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন সৈয়দ মীর হাসান আলী আর মাতা ছিলেন আবিদা রোকাইয়া খাতুন। তারা ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন এবং ইসলামের চার খলিফার অন্যতম হজরত আলী রা:-এর বংশধর ছিলেন। তার পূর্বপুরুষেরা ইসলাম প্রচারের জন্য এ দেশে এসেছিলেন। তিতুমীরের প্রপিতামহ ছিলেন মুঘলদের আমলে জাফরপুরের কাজী। তার ন্যায়বিচারের জন্য মুঘল রাজদরবার থেকে তাকে ‘কাজী ইনসাফ’ খেতাব দেয়া হয়েছিল।
তিতুমীরের পড়াশোনা শুরু হয়েছিল স্থানীয় মক্তবে। তারপর তিনি লেখাপড়া করেন মাদরাসায়। সেখানে তিনি হয়েছিলেন কুরআনে হাফেজ। তিনি বাংলা,আরবি, ফারসি এই তিন ভাষা রপ্ত করেছিলেন। তিনি এ সময় আরবি ফারসি সাহিত্যেও প্রভূত জ্ঞানার্জন করেন। জ্ঞানার্জন করেন ইসলামের অন্তর্নিহিত বাণীর ওপর। শারীরিক শক্তিতেও তিনি ছিলেন একজন পাহলোয়ান।
তিতুমীর ১৮২২ সালে হজব্রত পালনের জন্য মক্কা যান। সেখানে গিয়ে তার সাক্ষাৎ হয় বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ বেইরেলির সৈয়দ আহমদের সঙ্গে। সৈয়দ আহমদ তাকে দেশে ফিরে তাঁতি ও কৃষকদের মধ্যে ধর্মপ্রচার ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেন।
১৮২৭ সালে তিতুমীর দেশে ফিরে আসেন। স্বদেশে ফিরে তিনি ২৪ পরগনা ও নদিয়া জেলা এলাকার মুসলমানদের শিরক ও বেদাত কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাতে থাকেন। সংগঠিত করতে থাকেন অত্যাচারিত রায়ত, কৃষক আর তাঁতিদের। এই পর্যায়ে তার সঙ্ঘাতের শুরু হয় পুর্থার জমিদার কৃষ্ণদেব রাইয়ের সাথে। গোবর্ধনের ভূস্বামী গৌরীপ্রসাদ চৌধুরী, কামদাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সাথেও তার বিরোধ ও সংঘর্ষ বাধে। তারা দলবল নিয়ে তিতুমীরের আস্তানায় হামলা চালালে তিতুমীরের অনুসারীরা তাদের পিটিয়ে পিছু হটিয়ে দেন। এ সময় তিতুমীর হিন্দু জমিদারদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে অভিযোগ করেন। কিন্তু তাতে কোনো ফল হয় না।
১৮৩১ সালের অক্টোবরে তিতুমীর নারকেলবাড়িয়ায় বাঁশ দিয়ে এক শক্তিশালী দুর্গ বা কেল্লা নির্মাণ করেন। সেখানে তিনি তার অনুসারী মুজাহিদদের লাঠিয়ালের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার অনুসারী লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্যসংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তিনি নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করেন এবং ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। শিগগিরই তিনি ২৪ পরগনা, নদিয়া ও ফরিদপুর জেলায় তার আধিপত্য বিস্তার করেন। তিনি টাকি ও গোবরডাঙ্গার জমিদারদের কাছে কর দাবি করেন। এই জমিদারেরা নিজেরা তিতুমীরের সাথে পেরে না উঠে তখন ইংরেজের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এরপর কলকাতা থেকে ইংরেজদের একটি বাহিনী তিতুমীরকে দমন করতে বশিরহাটে পাঠানো হয়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় জমিদারদের বাহিনীও। কিন্তু তিতুমীরের বাহিনী বেশ কয়েকবার তার বাহিনী দিয়ে হানাদারদের পিটিয়ে তাড়িয়ে দেয়।
পরে নিপীড়ক জমিদারদের আহ্বানে উইলিয়াম বেনটিক লে. কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে তিতুমীরের বিরুদ্ধে অভিযানে ১০০ অশ্বারোহী, ৩০০ পদাতিক বাহিনী ও দু’টি কামান দিয়ে নারকেলবাড়িয়ার বাঁশের কেল্লা এলাকায় পাঠান। এই বাহিনী ১৮৩১ সালের ১৪ নভেম্বর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রসহ তিতুমীরের মুজাহিদ বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। মুজাহিদ বাহিনী বাঁশের কেল্লার ভেতর থেকে হামলার প্রতি উত্তর দিতে থাকেন। এর পরও কেবল লাঠি হাতে তিতুমীরের বাহিনী ছয় দিন ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। শেষে ব্রিটিশ বাহিনীর কামানের গোলায় বাঁশের কেল্লাটি ১৯ নভেম্বর ১৮৩১ ধ্বংস হয়ে যায়। তিতুমীরসহ প্রায় সাড়ে তিন শ’ মুজাহিদ এই যুদ্ধে শহীদ হন। তিতুমীরের মুজাহিদ বাহিনী প্রধান গোলাম মাসুমের ফাঁসি হয়। আর ১৪০ জন মুজাহিদকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেয়া হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন